Posts

Showing posts from September, 2020

বিদ্রোহী – কাজী নজরুল ইসলাম

 বল বীর – বল উন্নত মম শির! শির নেহারি’ আমারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির! বল বীর – বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি’ চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি’ ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া খোদার আসন ‘আরশ’ ছেদিয়া, উঠিয়াছি চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাতৃর! মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটীকা দীপ্ত জয়শ্রীর! বল বীর – আমি চির উন্নত শির! আমি চিরদূর্দম, দুর্বিনীত, নৃশংস, মহা- প্রলয়ের আমি নটরাজ, আমি সাইক্লোন, আমি ধ্বংস! আমি মহাভয়, আমি অভিশাপ পৃথ্বীর, আমি দুর্বার, আমি ভেঙে করি সব চুরমার! আমি অনিয়ম উচ্ছৃঙ্খল, আমি দ’লে যাই যত বন্ধন, যত নিয়ম কানুন শৃঙ্খল! আমি মানি না কো কোন আইন, আমি ভরা-তরী করি ভরা-ডুবি, আমি টর্পেডো, আমি ভীম ভাসমান মাইন! আমি ধূর্জটি, আমি এলোকেশে ঝড় অকাল-বৈশাখীর আমি বিদ্রোহী, আমি বিদ্রোহী-সুত বিশ্ব-বিধাতৃর! বল বীর – চির-উন্নত মম শির! আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন...

রবীন্দ্রনাথ – আল মাহমুদ

 এ কেমন অন্ধকার বঙ্গদেশ উত্থান রহিত নৈশব্দের মন্ত্রে যেন ডালে আর পাখিও বসে না। নদীগুলো দুঃখময়, নির্পতগ মাটিতে জন্মায় কেবল ব্যাঙের ছাতা, অন্যকোন শ্যামলতা নেই। বুঝি না, রবীন্দ্রনাথ কী ভেবে যে বাংলাদেশে ফের বৃক্ষ হয়ে জন্মাবার অসম্ভব বাসনা রাখতেন। গাছ নেই নদী নেই অপুষ্পক সময় বইছে পুনর্জন্ম নেই আর, জন্মের বিরুদ্ধে সবাই শুনুন, রবীন্দ্রনাথ আপনার সমস্ত কবিতা আমি যদি পুঁতে রেখে দিনরাত পানি ঢালতে থাকি নিশ্চিত বিশ্বাস এই, একটিও উদ্ভিদ হবে না আপনার বাংলাদেশ এ রকম নিষ্ফলা, ঠাকুর! অবিশ্বস্ত হাওয়া আছে, নেই কোন শব্দের দ্যোতনা, দু’একটা পাখি শুধু অশত্থের ডালে বসে আজও সঙ্গীতের ধ্বনি নিয়ে ভয়ে ভয়ে বাক্যালাপ করে; বৃষ্টিহীন বোশেখের নিঃশব্দ পঁচিশ তারিখে।

লিচু চোর – কাজী নজরুল ইসলাম

 বাবুদের তাল-পুকুরে হাবুদের ডাল-কুকুরে সে কি বাস করলে তাড়া, বলি থাম একটু দাড়া। পুকুরের ঐ কাছে না লিচুর এক গাছ আছে না হোথা না আস্তে গিয়ে য়্যাব্বড় কাস্তে নিয়ে গাছে গো যেই চড়েছি ছোট এক ডাল ধরেছি, ও বাবা মড়াত করে পড়েছি সরাত জোরে। পড়বি পড় মালীর ঘাড়েই, সে ছিল গাছের আড়েই। ব্যাটা ভাই বড় নচ্ছার, ধুমাধুম গোটা দুচ্চার দিলে খুব কিল ও ঘুষি একদম জোরসে ঠুসি। আমিও বাগিয়ে থাপড় দে হাওয়া চাপিয়ে কাপড় লাফিয়ে ডিঙনু দেয়াল, দেখি এক ভিটরে শেয়াল! ও বাবা শেয়াল কোথা ভেলোটা দাড়িয়ে হোথা দেখে যেই আঁতকে ওঠা কুকুরও জাড়লে ছোটা! আমি কই কম্ম কাবার কুকুরেই করবে সাবাড়! ‘বাবা গো মা গো’ বলে পাঁচিলের ফোঁকল গলে ঢুকি গিয়ে বোসদের ঘরে, যেন প্রাণ আসলো ধড়ে! যাব ফের? কান মলি ভাই, চুরিতে আর যদি যাই! তবে মোর নামই মিছা! কুকুরের চামড়া খিঁচা সেকি ভাই যায় রে ভুলা- মালীর ঐ পিটুনিগুলা! কি বলিস ফের হপ্তা! তৌবা-নাক খপ্তা…!

একুশের কবিতা – আল মাহমুদ

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুর বেলার অক্ত বৃষ্টি নামে, বৃষ্টি কোথায় ? বরকতের রক্ত। হাজার যুগের সূর্যতাপে জ্বলবে এমন লাল যে, সেই লোহিতেই লাল হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে ! প্রভাতফেরীর মিছিল যাবে ছড়াও ফুলের বন্যা বিষাদগীতি গাইছে পথে তিতুমীরের কন্যা। চিনতে না কি সোনার ছেলে ক্ষুদিরামকে চিনতে ? রুদ্ধশ্বাসে প্রাণ দিলো যে মুক্ত বাতাস কিনতে ? পাহাড়তলীর মরণ চূড়ায় ঝাঁপ দিল যে অগ্নি, ফেব্রুয়ারির শোকের বসন পরলো তারই ভগ্নী। প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী আমায় নেবে সঙ্গে, বাংলা আমার বচন, আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।

দুর্মর – সুকান্ত ভট্টাচার্য

 হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ কেঁপে কেঁপে ওঠে পদ্মার উচ্ছ্বাসে, সে কোলাহলে রুদ্ধস্বরের আমি পাই উদ্দেশ জলে ও মাটিতে ভাঙনের বেগ আসে। হঠাৎ নিরীহ মাটিতে কখন জন্ম নিয়েছে সচেতনতার দান, গত আকালের মৃত্যুকে মুছে আবার এসেছে বাংলাদেশের প্রাণ। “হয় দান নয় প্রাণ” এ শব্দে সারা দেশ দিশাহারা, একবার মরে ভুলে গেছে আজ মৃত্যুর ভয় তারা। সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়ঃ জ্বলে পুড়ে-মরে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়। এবার লোকের ঘরে ঘরে যাবে সোনালী নয়কো, রক্তে রঙিন দান, দেখবে সকলে সেখানে জ্বলছে দাউ দাউ করে বাংলাদেশের প্রাণ।।

তাহারেই পড়ে মনে – বেগম সুফিয়া কামাল

“হে কবি! নীরব কেন-ফাল্গুন যে এসেছে ধরায়, বসন্তে বরিয়া তুমি লবে না কি তব বন্দনায়?” কহিল সে স্নিগ্ধ আঁখি তুলি- “দখিন দুয়ার গেছে খুলি? বাতাবী নেবুর ফুল ফুটেছে কি? ফুটেছে কি আমের মুকুল? দখিনা সমীর তার গন্ধে গন্ধে হয়েছে কি অধীর আকুল?” “এখনো দেখনি তুমি?” কহিলাম “কেন কবি আজ এমন উন্মনা তুমি? কোথা তব নব পুষ্পসাজ?” কহিল সে সুদূরে চাহিয়া- “অলখের পাথার বাহিয়া তরী তার এসেছে কি? বেজেছে কি আগমনী গান? ডেকেছে কি সে আমারে? -শুনি নাই,রাখিনি সন্ধান।” কহিলাম “ওগো কবি, রচিয়া লহ না আজও গীতি, বসন্ত-বন্দনা তব কণ্ঠে শুনি-এ মোর মিনতি।” কহিল সে মৃদু মধুস্বরে- “নাই হ’ল, না হোক এবারে- আমার গাহিতে গান! বসন্তরে আনিতে ধরিয়া- রহেনি,সে ভুলেনি তো, এসেছে তো ফাল্গুন স্মরিয়া।” কহিলাম “ওগো কবি, অভিমান করেছ কি তাই? যদিও এসেছে তবু তুমি তারে করিলে বৃথাই।” কহিল সে পরম হেলায়- “বৃথা কেন? ফাগুন বেলায় ফুল কি ফোটে নি শাখে? পুষ্পারতি লভে নি কি ঋতুর রাজন? মাধবী কুঁড়ির বুকে গন্ধ নাহি? করে নি সে অর্ঘ্য বিরচন?” “হোক, তবু বসন্তের প্রতি কেন এই তব তীব্র বিমুখতা?” কহিলাম “উপেক্ষায় ঋতুরাজে কেন কবি দাও তুমি ব্যথা?” কহিল সে কাছে সরি আসি- “কুহেলী...

রবিহারা – কাজী নজরুল ইসলাম

 দুপুরের রবি পড়িয়াছে ধলে অস্ত- পথের কোলে শ্রাবনের মেঘ ছুটে এল দলে দলে উদাস গগন-তলে বিশ্বের রবি, ভারতের কবি, শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে। তব ধরিত্রী মাতার রোদন তুমি শুনেছিলে না কি, তাই কি রোগের ছলনা করিয়া মেলিলে না আর আঁখি? আজ বাংলার নাড়িতে নাড়িতে বেদনা উঠেছে জাগি’; কাঁদিছে সাগর নদী অরন্য, হে কবি, তোমার লাগি’। তব রসায়িত রসনায় ছিল নিত্য যে বেদ-বতী তোমার লেখনি ধরিয়াছিলেন যে মহা সরস্বতী, তোমার ধ্যানের আসনে ছিলেন যে শিব-সুন্দর, তোমার হৃদয় কুঞ্জে খেলিত সে মদন-মনোহর, যেই আনন্দময়ী তব সাথে নিত্য কহিত কথা, তাহাদের কেহ বুঝিলনা এই বঞ্ছিতদের ব্যথা? কেমন করিয়া দিয়া কেড়ে নিল তাঁদের কৃপার দান, তুমি যে ছিলে এ বাংলার আশা প্রদীপ অনির্বাণ। তোমার গরবে গরব করেছি, ধরারের ভেবেছি সরা; ভুলিয়া গিয়াছি ক্লৈব্য দীনতা উপবাস ক্ষুধা জরা। মাথার উপরে নিত্য জ্বলিতে তুমি সূর্যের মত, তোমারি গরবে ভাবিতে পারিনিঃ আমরা ভাগ্যহত। এত ভালোবাসিতে যে তুমি এ ভারতে ও বাংলায়, কোন অভিমানে তাঁদের আঁধারে ফেলে রেখে গেলে, হায়। বল- দর্পীর মাথার উপরে চরন রাখিয়া আর রখা করিবে কে এই দুর্বলের সে অহংকার? হের, অরন্য-কুন্ডল এলাইয়া ...

কবিতা এমন – আল মাহমুদ

 কবিতা তো কৈশোরের স্মৃতি। সে তো ভেসে ওঠা ম্লান আমার মায়ের মুখ; নিম ডালে বসে থাকা হলুদ পাখিটি পাতার আগুন ঘিরে রাতজাগা ভাই-বোন আব্বার ফিরে আসা, সাইকেলের ঘন্টাধ্বনি–রাবেয়া রাবেয়া– আমার মায়ের নামে খুলে যাওয়া দক্ষিণের ভেজানো কপাট! কবিতা তো ফিরে যাওয়া পার হয়ে হাঁটুজল নদী কুয়াশায়-ঢাকা-পথ, ভোরের আজান কিম্বা নাড়ার দহন পিঠার পেটের ভাগে ফুলে ওঠা তিলের সৌরভ মাছের আঁশটে গন্ধ, উঠানে ছড়ানো জাল আর বাঁশঝাড়ে ঘাসে ঢাকা দাদার কবর। কবিতা তো ছেচল্লিশে বেড়ে ওঠা অসুখী কিশোর ইস্কুল পালানো সভা, স্বাধীনতা, মিছিল, নিশান চতুর্দিকে হতবাক দাঙ্গার আগুনে নিঃস্ব হয়ে ফিরে আসা অগ্রজের কাতর বর্ণনা। কবিতা চরের পাখি, কুড়ানো হাঁসের ডিম, গন্ধভরা ঘাস ম্লান মুখ বউটির দড়ি ছেঁড়া হারানো বাছুর গোপন চিঠির প্যাডে নীল খামে সাজানো অক্ষর কবিতা তো মক্তবের মেয়ে চুলখোলা আয়েশা আক্তার।

তোমাকে ভালোবেসে – জীবনানন্দ দাশ

 আজকে ভোরের আলোয় উজ্জ্বল এই জীবনের পদ্মপাতার জল; তবুও এ-জল কোথা থেকে এক নিমিষে এসে কোথায় চ’লে যায়; বুঝেছি আমি তোমাকে ভালোবেসে রাত ফুরোলে পদ্মের পাতায়। আমার মনে অনেক জন্ম ধ’রে ছিলো ব্যথা বুঝে তুমি এই জন্মে হয়েছো পদ্মপাতা; হয়েছো তুমি রাতের শিশির- শিশির ঝরার স্বর সারাটি রাত পদ্মপাতার পর; তবুও পদ্মপত্রে এ-জল আটকে রাখা দায়। নিত্য প্রেমের ইচ্ছা নিয়ে তবুও চঞ্চল পদ্মপাতায় তোমার জলে মিশে গেলাম জল, তোমার আলোয় আলো হলাম তোমার গুণে গুণ; অনন্তকাল স্থায়ী প্রেমের আশ্বাসে করুণ জীবন ক্ষণস্থায়ী তবু হায়। এই জীবনের সত্য তবু পেয়েছি এক তিল পদ্মপাতায় তোমার আমার মিল আকাশ নীল, পৃথিবী এই মিঠে রোদ ভেসেছে, ঢেঁকিতে পাড় পড়ে; পদ্মপত্র জল নিয়ে তার- জল নিয়ে তার নড়ে; পদ্মপত্রে জল ফুরিয়ে যায়।

বিক্ষোভ – সুকান্ত ভট্টাচার্য

 দৃঢ় সত্যের দিতে হবে খাঁটি দাম, হে স্বদেশ, ফের সেই কথা জানলাম। জানে না তো কেউ পৃথিবী উঠছে কেঁপে ধরেছে মিথ্যা সত্যের টুঁটি চেপে, কখনো কেউ কি ভূমিকম্পের আগে হাতে শাঁখ নেয়, হঠাৎ সবাই জাগে? যারা আজ এত মিথ্যার দায়ভাগী, আজকে তাদের ঘৃণার কামান দাগি। ইতিহাস, জানি নীরব সাক্ষী তুমি, আমরা চেয়েছি স্বাধীন স্বদেশ ভূমি, অনেকে বিরূপ, কানে দেয় হাত চাপা, তাতেই কি হয় আসল নকল মাপা? বিদ্রোহী মন! আজকে ক’রো না মানা, দেব প্রেম আর পাব কলসীর কাণা, দেব, প্রাণ দেব মুক্তির কোলাহলে, জীন্ ডার্ক, যীশু, সোক্রোটিসের দলে। কুয়াশা কাটছে, কাটবে আজ কি কাল, ধুয়ে ধুয়ে যাবে কুৎসার জঞ্জাল, ততদিন প্রাণ দেব শত্রুর হাতে মুক্তির ফুল ফুটবে সে সংঘাতে। ইতিহাস! নেই অমরত্বের লোভ, আজ রেখে যাই আজকের বিক্ষোভ।।

পল্লী স্মৃতি – বেগম সুফিয়া কামাল

 বহুদিন পরে মনে পড়ে আজি পল্লী ময়ের কোল, ঝাউশাখে যেথা বনলতা বাঁধি হরষে খেয়েছি দোল কুলের কাটার আঘাত লইয়া কাঁচা পাকা কুল খেয়ে, অমৃতের স্বাদ যেন লভিয়াছি গাঁয়ের দুলালী মেয়ে পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসে খুশীতে বিষম খেয়ে, আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে। চৈত্র নিশির চাঁদিমায় বসি‘ শুনিয়াছি রূপকথা, মনে বাজিয়াছে সুয়ো দুয়োরাণী দুখিনি মায়ের ব্যথা। তবু বলিয়াছি মার গলা ধরে, “মাগো, সেই কথা বল, রাজার দুলালে পাষাণ করিতে ডাইনী করে কি ছল! সাতশ‘ সাপের পাহারা কাটায়ে পাতালবাসিনী মেয়ে, রাজার ছেলেরে বাঁচায়ে কি করে পৌঁছিল দেশে যেয়ে।” কল্পপূরীর স্বপনের কাঠি বুলাইয়া শিশু চোখে তন্দ্রদোলায় লয়ে যেত মোরে কোথা দূর ঘুমলোকে ঘুম হতে জেগে বৈশাখী ঝড়ে কুড়ায়েছি ঝরা আম খেলার সাথীরা কোথা আজ তারা? ভুলিয়াও গেছি নাম। নববর্ষার জলে অবগাহি কভু পুলকিত মনে গান গাহিয়াছি মল্লার রাগে বাদলের ধারা সনে; শিশির সিক্ত শেফালী ফুলের ঘন সৌরভে মাতি‘ শারদ প্রভাতে সখীগন সাথে আনিয়াছি মালা গাঁথি‘। পল্লী নদীর জলে ভাসাইয়া মোচার খেলার তরী, কাঁদিয়া ফিরেছি সাঁঝের আলোতে পুতুল বিদায় করি‘। আগামী দিনের আশা-ভরসার কত না মধুর ছবি ফুঁটিয়া উঠেছে আঁখির পা...

কোভিড ১৯ – মমতা ব্যানার্জি

 বস্তাপচা ময়লায় ঢেকে গেছে পৃথিবীটা মানুষ, মানুষ থেকে দূরে। ছোঁয়া যাবেনা – স্নেহের পরশকে। কালও যা ছিল – হাতের ছোঁয়ায় আশির্বাদ আজ তা পরশমনির স্পর্শ থেকে বাদ। এ কি ভয়ার্ত বেশ … সারাবিশ্ব এক থেকে অন্যে – সন্দিহান অবকাশের নিশিরাত্রি! মাত্র দুমাসে পৃথিবীর হাওয়া বদল! দেখা হল কথা হল না। মনটায় মেঘের ছায়া, চুলগুলো উদভ্রান্ত। কারো সাথে দেখা হল – কথা হচ্ছে না। সারা পৃথিবীটা – বদলে গেল। বদলে গেল মানসিকতা – সবাই দূরে দূরে। দূরের দূরত্বটাই আজ সবচেয়ে বেশি ভরসার। সারা বিশ্ব আজ বিশ্ব পন্ডিত! কি পারলোনা – একটা ভাইরাসকে দমন করতে? হার মানলো সারা বিশ্ব? সবার মুখ দেখা সবার জন্য বন্ধ। সব গবেষণাকে জব্দ করলো একটা মাত্র শব্দ করোনা, কোভিড ১৯।

ঈদের চাঁদ - কাজী নজরুল ইসলাম

 সিঁড়ি-ওয়ালাদের দুয়ারে এসেছে আজ চাষা মজুর ও বিড়িওয়ালা; মোদের হিস্‌সা আদায় করিতে ঈদে দিল হুকুম আল্লাতালা! দ্বার খোলো সাততলা-বাড়িওয়ালা, দেখো কারা দান চাহে, মোদের প্রাপ্য নাহি দিলে যেতে নাহি দেব ঈদ্গাহে! আনিয়াছে নবযুগের বারতা নতুন ঈদের চাঁদ, শুনেছি খোদার হুকুম, ভাঙিয়া গিয়াছে ভয়ের বাঁধ। মৃত্যু মোদের ইমাম সারথি, নাই মরণের ভয়; মৃত্যুর সাথে দোস্তি হয়েছে – অভিনব পরিচয়। যে ইসরাফিল প্রলয়-শিঙ্গা বাজাবেন কেয়ামতে– তাঁরই ললাটের চাঁদ আসিয়াছে, আলো দেখাইতে পথে। মৃত্যু মোদের অগ্রনায়ক, এসেছে নতুন ঈদ, ফিরদৌসের দরজা খুলিব আমরা হয়ে শহিদ। আমাদের ঘিরে চলে বাংলার সেনারা নৌজোয়ান, জানি না, তাহারা হিন্দু কি ক্রিশ্চান কি মুসলমান। নির্যাতিতের জাতি নাই, জানি মোরা মজলুম ভাই – জুলুমের জিন্দানে জনগণে আজাদ করিতে চাই! এক আল্লার সৃষ্ট সবাই, এক সেই বিচারক, তাঁর সে লীলার বিচার করিবে কোন ধার্মিক বক? বকিতে দিব না বকাসুরে আর, ঠাসিয়া ধরিব টুঁটি এই ভেদ-জ্ঞানে হারায়েছি মোরা ক্ষুধার অন্ন রুটি। মোরা শুধু জানি, যার ঘরে ধনরত্ন জমানো আছে, ঈদ আসিয়াছে, জাকাত আদায় করিব তাদের কাছে। এসেছি ডাকাত জাকাত লইতে, পেয়েছি তাঁর হুকুম, কেন মোরা ক...

জেলগেটে দেখা – আল মাহমুদ

সেলের তালা খোলা মাত্রই এক টুকরো রোদ এসে পড়লো ঘরের মধ্যে আজ তুমি আসবে । সারা ঘরে আনন্দের শিহরণ খেলছে । যদিও উত্তরের বাতাস হাড়েঁ কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে বইছে , তবু আমি ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ ধুয়ে নিলাম। পাহারাদার সেন্ট্রিকে ডেকে বললাম, আজ তুমি আসবে । সেন্ট্রি হাসতে হাসতে আমার সিগ্রেটে আগুন ধরিয়ে দিল । বলল , বারান্দায় হেটেঁ ভুক বাড়িয়ে নিন দেখবেন , বাড়ী থেকে মজাদার খাবার আসবে । দেখো , সবাই প্রথমে খাবারের কথা ভাবে । আমি জানি বাইরে এখন আকাল চলছে । ক্ষুধার্ত মানুষ হন্যে হয়ে শহরের দিকে ছুটে আসছে । সংবাদপত্রগুলোও না বলে পারছে না যে এ অকল্পনীয় । রাস্তায় রাস্তায় অনাহারী শিশুদের মৃতদেহের ছবি দেখে আমি কতদিন আমার কারাকক্ষের লোহার জালি চেপে ধরেছি । হায় স্বাধীনতা , অভুক্তদের রাজত্ব কায়েম করতেই কি আমরা সর্বস্ব ত্যাগ করেছিলাম । আর আমাকে ওরা রেখেছে বন্দুক আর বিচারালয়ের মাঝামাঝি যেখানে মানুষের আত্মা শুকিয়ে যায় । যাতে আমি আমরা উৎস খুঁজে না পাই । কিন্তু তুমি তো জানো কবিদের উৎস কি ? আমি পাষাণ কারার চৌহদ্দিতে আমার ফোয়ারাকে ফিরিয়ে আনি । শত দুর্দৈবের মধ্যেও আমরা যেমন আমাদের উৎসকে জাগিয়ে রাখতাম । চড়ুই পাখির চিৎকারে বন্দ...