Posts

নোলক – আল মাহমুদ (সত্যিকার ঘটনার উপর ভিত্তি করে লেখা)

 আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে। নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে ? -হাত দিওনা আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে। বললো কেঁদে তিতাস নদী হরিণবেড়ের বাঁকে শাদা পালক বকরা যেথায় পাখ ছড়িয়ে থাকে। জল ছাড়িয়ে দল হারিয়ে গেলাম বনের দিক সবুজ বনের হরিণ টিয়ে করে রে ঝিকমিক। বনের কাছে এই মিনতি, ফিরিয়ে দেবে ভাই, আমার মায়ের গয়না নিয়ে ঘরকে যেতে চাই। কোথায় পাবো তোমার মায়ের হারিয়ে যাওয়া ধন আমরা তো সব পাখপাখালি বনের সাধারণ। সবুজ চুলে ফুল পিন্দেছি নোলক পরি নাতো ! ফুলের গন্ধ চাও যদি নাও, হাত পাতো হাত পাতো বলে পাহাড় দেখায় তাহার আহার ভরা বুক হাজার হরিণ পাতার ফাঁকে বাঁকিয়ে রাখে মুখ। এলিয়ে খোঁপা রাত্রি এলেন, ফের বাড়ালাম পা আমার মায়ের গয়না ছাড়া ঘরকে যাবো না।

না ঘুমানোর দল – আল মাহমুদ

নারকেলের ঐ লম্বা মাথায় হঠাৎ দেখি কাল ডাবের মতো চাদঁ উঠেছে ঠান্ডা ও গোলগাল । ছিটকিনিটা আস্তে খুলে পেরিয়ে এলেম ঘর ঘুমন্ত এই মস্ত শহর করছিলো থরথর। মিনারটাকে দেখছি যেন দাড়িয়ে আছেন কেউ, পাথরঘাটার গির্জেটা কি লাল পাথরের ঢেউ ? চৌকিদারের হাক শুনে যেই মোড় ফিরেছি বায় – কোত্থেকে এক উটকো পাহাড় ডাক দিল আয় আয় । পাহাড়টাকে হাত বুলিয়ে লাল দিঘীটার পাড় এগিয়ে দেখি জোনাকিদের বসেছে দরবার । আমায় দেখে কলকলিয়ে দীঘির কালো জল বললো, এসো, আমরা সবাই না ঘুমানোর দল- পকেট থেকে খুলো তোমার পদ্য লেখার ভাজঁ রক্তজবার ঝোপের কাছে কাব্য হবে আজ । দীঘির কথায় উঠলো হেসে ফুল পাখিদের সব কাব্য হবে, কাব্য হবে- জুড়লো কলরব । কী আর করি পকেট থেকে খুলে ছড়ার বই পাখির কাছে, ফুলের কাছে মনের কথা কই ।

পাখির মতো – আল মাহমুদ

আম্মা বলেন, পড়রে সোনা আব্বা বলেন, মন দে; পাঠে আমার মন বসে না কাঁঠালচাঁপার গন্ধে। আমার কেবল ইচ্ছে জাগে নদীর কাছে থাকতে, বকুল ডালে লুকিয়ে থেকে পাখির মতো ডাকতে। সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে কর্ণফুলীর কূলটায়, দুধভরা ঐ চাঁদের বাটি ফেরেস্তারা উল্টায়। তখন কেবল ভাবতে থাকি কেমন করে উড়বো, কেমন করে শহর ছেড়ে সবুজ গাঁয়ে ঘুরবো ! তোমরা যখন শিখছো পড়া মানুষ হওয়ার জন্য, আমি না হয় পাখিই হবো, পাখির মতো বন্য।

ভর দুপুরে – আল মাহমুদ

মেঘনা নদীর শান্ত মেয়ে তিতাসে মেঘের মত পাল উড়িয়ে কী ভাসে! মাছের মত দেখতে এ কোন পাটুনি ভর দুপুরে খাটছে সখের খাটুনি। ওমা এ-যে কাজল বিলের বোয়ালে পালের দড়ি আটকে আছে চোয়ালে আসছে ধেয়ে লম্বা দাড়ি নাড়িয়ে, ঢেউয়ের বাড়ি নাওয়ের সারি ছাড়িয়ে। কোথায় যাবে কোন উজানে ও-মাঝি আমার কোলে খোকন নামের যে-পাজি হাসেছ, তারে নাও না তোমার নায়েতে গাঙ-শুশুকের স্বপ্নভরা গাঁয়েতে; সেথায় নাকি শালুক পাতার চাদরে জলপিপিরা ঘুমায় মহা আদরে, শাপলা ফুলের শীতল সবুজ পালিশে থাকবে খোকন ঘুমিয়ে ফুলের বালিশে।

হায়রে মানুষ – আল মাহমুদ

একটু ছিল বয়েস যখন ছোট্ট ছিলাম আমি আমার কাছে খেলাই ছিল কাজের চেয়ে দামি। উঠোন জুড়ে ফুল ফুটেছে আকাশ ভরা তারা তারার দেশে উড়তো আমার পরাণ আত্মহারা। জোছনা রাতে বুড়িগঙ্গা তুলতো যখন ঢেউ আমার পিঠে পরীর ডানা পরিয়ে দিতো কেউ। দেহ থাকতো এই শহরে উড়াল দিতো মন মেঘের ছিটার ঝিলিক পেয়ে হাসতো দু’নয়ন।   তারায় তারায় হাঁটতো আমার ব্যাকুল দু’টি পা নীল চাঁদোয়ার দেশে হঠাৎ রাত ফুরাতো না। খেলার সাথী ছিল তখন প্রজাপতির ঝাঁক বনভাদালির গন্ধে কত কুটকুটোতো নাক; কেওড়া ফুলের ঝোল খেয়ে যে কোল ছেড়েছে মা’র তার কি থাকে ঘরবাড়ি না তার থাকে সংসার ? তারপরে যে কী হলো, এক দৈত্য এসে কবে পাখনা দুটো ভেঙে বলে মানুষ হতে হবে। মানুষ হওয়ার জন্য কত পার হয়েছি সিঁড়ি গাধার মত বই গিলেছি স্বাদ যে কি বিচ্ছিরি।     জ্ঞানের গেলাস পান করে আজ চুল হয়েছে শণ কেশের বাহার বিরল হয়ে উজাড় হলো বন। মানুষ মানুষ করে যারা মানুষ তারা কে ? অফিস বাড়ির মধ্যে রোবোট কলম ধরেছে। নরম গদি কোশন আসন চশমা পরা চোখ লোক ঠকানো হিসেব লেখে, কম্প্যুটারে শ্লোক। বাংলাদেশের কপাল পোড়ে ঘূর্ণিঝড়ে চর মানুষ গড়ার শাসন দেখে বুক কাঁপে থরথর। ‘হায়রে মানুষ র...

কাঁপুনি – আল মাহমুদ

 শেষ হয়নি কি, আমাদের দেয়া-নেয়া? হাত তুলে আছে, পাড়ানি মেয়েটি বিদায়ের শেষ খেয়া, ডাকছে আমাকে হাঁকছে আমাকে আমিই শেষের লোক। শ্লোক শেষ হলো, অন্ত-মিলেরও শেষ। কাঁপছে নায়ের পাটাতন বুঝি ছেড়ে যেতে উৎসুক। আমি চলে গেলে এ পারে আঁধারে কেউ থাকবে না আর সব ভেসে গেছে এবার তবে কি ভাসাবো অন্ধকার? আলো-আঁধারির এই খেলা তবে আমাকে নিয়েই শেষ আমার শরীর কাঁপছে যেমন কাঁপছে বাংলাদেশ।

মানুষ – কাজী নজরুল ইসলাম

 গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান, নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি, সব দেশে, সল কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি। ‘পূজারী, দুয়ার খোল, ক্ষুদার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’ স্বপ্ন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয় দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়! জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুদায় কন্ঠ ক্ষীণ ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোল বাবা, খাইনি তো সাত দিন!’ সহসা বন্ধ হ’ল মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে, তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুদার মানিক জ্বলে! ভুখারী ফুকারি’ কয়, ‘ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’ মসজিদে কাল শিরনী আছিল, অঢেল গোস্ত রুটি বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি! এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে-আজারির চিন্ বলে ‘বাবা, আমি ভুকা ফাকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’ তেরিয়াঁ হইয়া হাঁকিল মোল্লা – “ভ্যালা হ’ল দেখি লেঠা, ভুখা আছ মর গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?” ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – তা’ হলে শালা সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা! ভুখারী ফিরিয়া চলে, চলিতে চলিতে বলে- “আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু, আমার ক্ষুদার অন...